এ বিষয়ে ঢাকার ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিষয়ের বিভাগীয় প্রধান ও জীববিজ্ঞানী প্রফেসর রাগিবউদ্দিন আহমদ বলেন, আমাদের বঙ্গোপসাগরে অনেক প্রজাতির বার্নাকল আছে। খুব ছোট থেকে গভীর সাগরে অনেক বড় প্রজাতির বার্নাকল আছে। এরা পাথর, কাঠসহ যেকোনো শক্ত পদার্থে আটকে থাকে তাদের পা সদৃশ আটালো অংশ দিয়ে। এরা লোনা পানিতে বেঁচে থাকে এবং দ্রুত প্রজনন করে। ভাটার সময় জোয়ারে তলিয়ে যায়। সেন্টমার্টিনসের এমন ডুবো পাথরে ভিন্ন প্রজাতির বার্নাকল দেখা যায়। মহেশখালীর ল্যান্ডিং ব্রিজের পিলারের গায়ে এক প্রজাতির বার্নাকল দেখা যায়। এদের শরীরের কিনারা ব্লেডের চেয়েও বেশি ধারালো। সামুদ্রিক কচ্ছপের পিঠে, তিমি মাছের গায়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির বার্নাকল দেখা যায়। তিনি জানান, ইউরোপের স্পেন ও পর্তুগালসহ উত্তর আমেরিকার অভিজাত মার্কেটগুলোতে প্রতি কেজি বার্নাকলের দাম ২শ ডলারের কাছাকাছি। জাপান, থাইল্যান্ড ও চীনেও এটা মানুষের খাদ্য। এরা সাগরে অয়েস্টারের মতোই বার্নাকলের চাষ করে।
সামুদ্রিক মৎস্য বিজ্ঞানী, বাংলাদেশ ফিশারিজ রিচার্স ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, সম্প্রতি কক্সবাজার সৈকতে ভেসে আসা জৈব ও অজৈব বর্জ্যে বার্নাকলের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। সেটি গুজ বার্নাকল (এড়ড়ংব ইধৎহধপষব) বা হংসমুখ বার্নাকল। এটি খাদ্য হিসাবে ইউরোপে পেরিসিবিস নামে বেশি পরিচিত।
তিনি বলেন, বার্নাকল দেখতে মলাস্ক বা শামুক-ঝিনুকের মতো মনে হলেও এটি আসলে ক্রাস্টাসিন; যা কাঁকড়া ও লবস্টারের কাছাকাছি একটি সামুদ্রিক প্রাণী। খাদ্য হিসাবেও এর স্বাদ কাঁকড়ার মতো।
কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, পৃথিবীতে প্রায় এক হাজার প্রজাতির বার্নাকল দেখা যায়। এর মধ্যে কাছিমের গায়ে আটকায় এমন ২৯ প্রজাতির বার্নাকলও রয়েছে। বার্নাকল হলো এনক্রাস্টার, যারা অস্থায়ীভাবে একটি শক্ত সাবস্ট্রেটে সংযুক্ত থাকে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ‘অ্যাকোন বার্নাকল’ (স্যাসিলিয়া), যা দেখতে ক্রিস্টাল বা নির্মল। এদের স্তূপগুলো সরাসরি স্তরটিতে বাড়ানো হয়। আর গুস বার্নাকলসহ অন্যান্য বার্নাকল একটি ডাঁটার মাধ্যমে নিজেকে সংযুক্ত করে। কক্সবাজারের কাঁকড়ার ঘেরেও বার্নাকলের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। এরা কাঁকড়ার শরীরেও বাসা বাঁধে।
তিনি জানান, ভাসমান কোনো কিছু পেলেই ওরা আটকে থাকে বলে এদেরকে নাছোড়বান্দা সঙ্গী বলা হয়। বার্নাকল গুগলি শামুক নামেও পরিচিত।
কক্সবাজারের স্থানীয় ভাষায় বার্নাকলকে ‘ছিলইন’ বলা হয়। এটি কক্সবাজারের রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী খাবার। তবে বাঙালিরা খায় না। সাধারণত বার্নাকলকে গুঁড়ো করে পোলট্রি ও ফিশারিজ খাদ্য হিসাবে কেজি প্রতি সর্বোচ্চ ২৫ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। অথচ স্পেনের অন্যতম ও সবচেয়ে দর্শনীয় খাবারটি হলো গুজ বার্নাকল বা ছিলইন। এ খাবারটি ঐতিহ্যগতভাবে স্পেনের উত্তরে গ্যালিসিয়ায় ওয়েভ বাটারড শিলা থেকে কাটা হয়। খাবারটি পেরিসিবিস নামে বেশি পরিচিত। মরক্কো থেকেও বার্নাকলের আমদানি করে ইউরোপের দেশগুলো। সম্প্রতি উত্তর আমেরিকায় উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় একটি উৎস থেকে বার্নাকল সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানান বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীরা জানান, বার্নাকল হলো ক্রাস্টেসিয়ানগুলোর একটি বিশেষায়িত গোষ্ঠী। তারা প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে একটি নির্লজ্জ ভ্রাম্যমাণ জীবনধারা বিকাশ করে এবং পাথর, জাহাজ, তিমি বা সমুদ্রের কচ্ছপের মতো বিভিন্ন স্তরে নিজেকে যুক্ত করে। এরা প্রাথমিকভাবে খণ্ড লার্ভা আকারে জন্ম নেয়। প্রথম ছয় মাস নপলিয়াস লার্ভা পর্যায়ে আর সপ্তম মাসে সাইপ্রিড লার্ভা পর্যায়ে নতুন স্থরটিতে বিকশিত ও স্থির হয়। সাইপ্রিড লার্ভাতে এন্টেনা আটকানোর কাপের মতো একটি বিশেষ সংযুক্তি ডিভাইস রয়েছে, যা দিয়ে এরা নিজেকে সাবস্ট্রেটে আটকে রাখতে পারে। একবার আটকাতে পারলে এরপর প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে বিকশিত হয় এবং বিভিন্ন উপায়ে সংযুক্ত হয়। ফলে এদের চাষবাসও সহজ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, খোলা সমুদ্রে মেরিকালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে এই সামুদ্রিক প্রাণীর চাষ করে দেশের ব্লু-ইকনোমির নতুন দুয়ার খুলে যেতে পারে।
মেরিকালচার প্রজনন প্রযুক্তির মাধ্যমে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয় মৎস্য মন্ত্রণালয়। ‘উপকূলীয় ও বঙ্গোপসাগরের জলজ সম্পদ উন্নয়নে’ গৃহীত প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পের অধীনে মেরিকালচার নিয়ে গবেষণার কথাও বলা হয়েছে। বর্তমানে মেরিকালচার প্রযুক্তিতে শীর্ষ স্থানে রয়েছে ভারত, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। এসব দেশে মেরিকালচার লাভজনক হওয়ায় আমাদের দেশেও এই প্রজনন প্রযুক্তি অর্জনের জন্য গবেষণা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ।
তিনি জানান, খোলা সমুদ্রে ট্যাংক বসিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সামুদ্রিক মৎস্যচাষ হলো মেরিকালচার। মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য উন্নত বিশ্বে এ পদ্ধতিতে চিংড়ি, ওয়েস্টার, সেলফিশ, ফিনফিশ ও সী-উইড বা সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদন করা হয়। তবে বার্নাকলের চাষ সম্পর্কে এখনো আমরা গবেষণা শুরু করতে না পারলেও আশা করি অদূর ভবিষ্যতে পারব।

সুত্রঃ দৈনিক আজাদী: