সোমবার, ১৭ মে ২০২১, ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন

রিপোর্টারের ডায়েরি : একজন কীর্তিমান কামাল হোসেনের বিদায়

কলাম / ২৫৪ বার
আপডেট বুধবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২১, ৫:৪৫ পূর্বাহ্ন

॥ তোফায়েল আহমদ ॥

ফুলের প্রতিই বড্ড ভালবাসা তাঁর। ফুল হাতে কক্সবাজারে এসেছিলেন তিনি। শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শুরু করেছিলেন কক্সবাজার জেলায় তাঁর দাপ্তরিক কর্মকান্ড। কক্সবাজারে আগত অতিথিদের বিমান বন্দরে ফুল দিয়ে সম্ভাষণ জানানোর রেওয়াজও তাঁর হাতে। নিজ কার্যালয়েও চালু করা হয়েছে ফুলেল শুভেচ্ছার কসরত। এমনকি আজ বুধবার সকালে কক্সবাজার ত্যাগ করবেনও ৩০ লাখ শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় শহীদ মিনারে ফুলের তোড়া রেখে। বলতে গেলে কক্সবাজারে টানা তেত্রিশ মাসের তাঁর দায়িত্ব পালনকালিন সময়টুকুেত কক্সবাজার জেলাটিকেই তিনি ফুল দিয়ে সাঁজিয়ে গেলেন। ফুটিয়েও গেলেন ফুল।
তিনি মোঃ কামাল হোসেন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের বিশতম ব্যাচের একজন মেধাবি সরকারি কর্মকর্তা। কক্সবাজার জেলার বাইশতম জেলা প্রশাসক তিনি। কক্সবাজারে প্রায় তিন বছরের কর্মকালীন সময়ে ইতিমধ্যে মোঃ কামাল হোসেন জেলাবাসীর কাছে একজন মানবিক ও সৃষ্টিশীল জেলা প্রশাসক হিসাবে পরিচিতি লাভ করতে সমর্থ হয়েছেন। জেলা শহরের একজন শিক্ষক এ প্রসঙ্গে জানালেন এ পর্যন্ত তাঁকেই (মোঃ কামাল হোসেন) ‘মানবিক জেলা প্রশাসক’ হিসাবে দেখতে পেয়েছেন।
জনগনের প্রতি সদাচরণ, বঞ্চিত জনগোষ্ঠিকে অধিক সেবা দান, কঠোরতা পরিহার করে মানুষের প্রতি দরদ প্রদর্শন, ন্যায়-নিষ্টতা থেকে জনবান্ধব আচরণ সহ ইত্যাদি কারণেই জনাব মোঃ কামাল হোসেন পেয়েছেন মানবিক জেলা প্রশাসক পরিচিতি।

বাস্তবে কক্সবাজার জেলা শহরের সার্কিট হাউজ সড়কে ‘অরুণোদয়’ নামের একটি স্কুল প্রতিষ্টা করেই তিনি সবচেয়ে বেশী মানুষের হৃদয়ে স্থান পেয়েছেন। অটিষ্টিক শিশুদের জন্যই স্কুলটি। একদিন স্কুলটিতে একজন অটিষ্টিক শিশুর মা শিশুটিকে নিয়ে একটি পরিবারের কি রকম ভোগান্তি সেই দুঃসহ বিবরণ আমাকে শুনিয়েছিলেন। সেই মায়ের কথা আমাকে নাড়া দিয়েছিল। ‘অরুণোদয়ে’ এরকম হতভাগি মায়ের সংখ্যা বর্তমানে আড়াই শতাধিক। অর্থাৎ অরুণোদয় স্কুলটিতে আড়াইশর বেশী অটিষ্টিক শিক্ষার্থী রয়েছে। জেলায় এটিই একমাত্র অটিষ্টিক স্কুল। যে স্কুলটিতে তিনি স্থাপনও করেছেন জাতির জনকের একটি ম্যুরাল।
জেলা প্রশাসক জানিয়েছিলেন, তাঁর সহধর্মিনী প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের পরিচালক উপসচিব গুলশান আরা অটিষ্টিক স্কুলটির নাম ‘অরুণোদয়’ রেখেছিলেন। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন এসব শিশুদের প্রতি জেলা প্রশাসকের এতই দরদ যে, তিনি প্রায় প্রতিদিন স্কুলে গিয়ে শিশুদের সাথে মেলামেশা করে থাকেন। স্কুলটি নিয়ে দৈনিক কালের কন্ঠে আমার একটি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল সেই প্রতিবেদনটি । এমনকি সেই প্রতিবেদনের উদ্বৃতি দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেনের গড়া অরুণোদয় নিয়ে ভূয়সি প্রশংসা করে নিজ ফেসবুক আইডিতে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের এরকম মানবিক কাজে এগিয়ে আসার আহবানও জানিয়েছিলেন।
বিদায়ী জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন কে দেখা গেছে, তিনি প্রায়শ নতুন কিছু সৃষ্টির জন্য বেশ আগ্রহী ছিলেন। পঁচাত্তরের ভয়াল ১৫ আগষ্টের বিয়োগান্তুক ঘটনা নিয়ে কি করা যায়-এমন ভাবনা থেকেই তিনি ২০১৮ সালের আগষ্টে কক্সবাজার সাগর পাড়ের লাবণী পয়েন্টের বালুচরে আয়োজন করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনী। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সাথে সম্পৃত্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ফটো সাংবাদিক পাভেল রহমানের এরকম ছবি প্রদর্শনীটি ছিল একদম ব্যতিক্রম। প্রদর্শনীর পর জনাব পাভেল রহমানের কাছে শুনেছিলাম-মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার সাগর পাড়ে ছবি প্রদর্শনীর বিষয়টি জেনে নিজেও বেশ খুশি হয়েছিলেন। সর্বশেষ সাগর পাড়ের একই স্থানে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে তিনিই জাতির জনকের বালু ভাস্কর্য তৈরী করে দেখালেন- এদেশ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের।
এরকম একে একে বিদায়ী জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন তাঁর কার্যকালীন সময়ে কক্সবাজারে গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে ব্যতিক্রম কিছু জেলাবাসীর জন্য দেয়ার চেষ্টা করে গেছেন। যার অন্যতম হচ্ছে ‘ডিসি কলেজ’ নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্টান প্রতিষ্টা করা। কলেজটি প্রতিষ্টার প্রথম অনুষ্টিত সভায় তিনি বলেছিলেন-‘আমার লজ্জা হয়, কক্সবাজারের শিক্ষার হারের পরিসংখ্যানটি বলতে হলে।’ দেশের এমন একটি অগ্রসরমান জেলায় শিক্ষার হার এরকম পিছিয়ে থাকার বিষয়টি কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায়না। তাই একদিকে শিক্ষার হার বৃদ্ধি অপরদিকে শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর ব্যাপারে তাগিদ নিয়েই তিনি কলেজটি প্রতিষ্টা করেন।
মোঃ কামাল হোসেন ঝালকাঠি জেলার বাসিন্দা। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং স্কুল শিক্ষকের সন্তান তিনি। যে মুক্তিযোদ্ধারা জীবনকে বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন এমন একজন ত্যাগি বীর যোদ্ধার সন্তান হবেন খাঁটি দেশপ্রেমিক-এটাই স্বাভাবিক। আর যিনি শিক্ষা দিয়ে জাতি গঠণে অনন্য ভুমিকা রেখেছেন এমন একজন শিক্ষক পিতার সন্তান জাতিকে শিক্ষিত করার চেষ্টা করবেন-এটাও স্বাভাবিক। তবে এসব কক্সবাজারে না করলে তাঁর এমন কিইবা ক্ষতি হত ? তাঁর মাসিক বেতন কি কমে যেত বা বন্ধ হয়ে যেত ? তিনি কি তিরষ্কৃত হতেন ? অটিষ্টিক শিশুদের স্কুল অরুণোদয় প্রতিষ্ঠা না করলে তাঁর এমন কি অসুবিধা হত ?
শিক্ষা-দীক্ষা প্রসার এবং মানবিক এসব কাজ করার পরও যখন জেলা প্রশাসক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কতিপয় আইডিতে সমালোচনার শিকার হচ্ছিলেন, এসব কারনে তিনি মনোবেদনায় এক প্রকার থেমেই গিয়েছিলেন। কিন্তু বিশাল অন্তরের মানুষ বলে কথা। উদার মনের এ মানুষটি বেশীদিন গু ধরে থাকতে পারলেন না। তিনি বিদায় বেলায় আবার সৃষ্টিতে এগুলেন। সর্বশেষ জেলাবাসীর জন্য একটি শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় হাত দিলেন। সেই হাসপাতালটির প্রাথমিক কাজও ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছেন তিনি। এরকম অনেক কাজ রয়েছে, যে সবের তালিকাও বহু দীর্ঘ। জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন তাঁর স্বল্পকালীন সময়ে কক্সবাজার জেলাবাসীর মন জয় করেছেন। যার প্রমাণ বিদায় বেলায় তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে গত দু’সপ্তাহ ধরে ভালবাসার মানুষগুলোর ঢল পড়েছে। বিদায় নিতে গিয়ে জেলা প্রশাসক এবং সরকারের উপ সচিব মোঃ কামাল হোসেন ও তাঁর সহধর্মিনী উপ সচিব গুলশান আরা আবেগাপ্লুত কন্ঠেই বলেন-‘ অরুণোদয়’ এবং ‘ডিসি কলেজ’ আমাদের দু’টি সন্তান। আমাদের সন্তানদ্বয়কে আপনারা জেলাবাসী আদর-যত্নে দেখে রাখবেন।’-

লেখক: তোফায়েল আহমদ, বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক কালের কন্ঠ, কক্সবাজার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

এক ক্লিকে বিভাগের খবর
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: