সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন

মোটরসাইকেলে ধাক্কায় সাম্রাজ্য ওলটপালট

দৈনিক যুগান্তর: / ৭৮ বার
আপডেট সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন

# অবৈধ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিসহ নানা অপকর্মের অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক, বিএফআইইউসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

ছেলে ইরফান সেলিমের গাড়ি একটি মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রীতিমতো ওলটপালট হয়ে পড়েছে সংসদ সদস্য (এমপি) হাজী সেলিমের হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য।

তিন দশক ধরে দখলদারি-চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মের অভিযোগের মুখে গড়ে তোলা এ সাম্রাজ্য রক্ষায় দিশেহারা সেলিম ও তার পরিবার। তাদের অন্যায়-অপরাধের বিরুদ্ধে চলছে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার বহুমুখী অনুসন্ধান।

পাশাপাশি অবৈধভাবে দখল হওয়া জমি উদ্ধারে সোচ্চার হয়েছেন প্রকৃত মালিকরা। শুধু তাই নয়, তার পাশে নেই ক্ষমতাসীন দলও।

আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় সরকারের আমলে পুরান ঢাকার এই দাপুটে নেতা ছিলেন এলাকার মূর্তমান আতঙ্ক। ভয়ে এতদিন তার অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস করেননি।

পুলিশ, র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ইরফান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৫টি মামলা সামনে রেখে এই পরিবারের অপরাধ অনুসন্ধান করছে।

এমপি সেলিম ও তার পরিবারের অবৈধ অর্থের সন্ধানে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মানি লন্ডারিংসহ আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

রোববার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর রাজধানীর কলাবাগান ক্রসিংয়ের কাছে মারধরের শিকার হন নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ওয়াসিফ আহমেদ খান। তার মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়েছিল সংসদ সদস্যের স্টিকার লাগানো একটি গাড়ি।

যে গাড়িতে ছিলেন হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিম। এরপর গাড়িটি থেকে কয়েক ব্যক্তি নেমে ওই কর্মকর্তাকে বেদম মারধর এবং তার স্ত্রীকে নাজেহাল করে।

এ ঘটনায় সেই রাতে জিডি হলেও সোমবার সকাল ৮টার দিকে ধানমণ্ডি থানায় একটি মামলা হয়। এতে নৌবাহিনী কর্মকর্তা ওয়াসিফ আহমেদ খান মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনেন।

এরপর সোমবার পুরান ঢাকার চকবাজারে হাজী সেলিমের রাজসিক প্রাসাদ ‘চাঁন সরদার দাদা বাড়ী’তে দিনভর অভিযান চালায় র‌্যাব।

এ সময় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত মাদক রাখার দায়ে ইরফানকে এক বছর কারাদণ্ড ও অবৈধ ওয়াকিটকি রাখার কারণে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন। ইরফানের দেহরক্ষী জাহিদকে অবৈধ ওয়াকিটকি বহন করার দায়ে ছয় মাস সাজা দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

বর্তমানে তারা ডিবি হেফাজতে তিন দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। আজ তাদের রিমান্ড শেষ হবে। অভিযানের পর চকবাজার থানায় এই দু’জনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে আরও চারটি মামলা হয়।

এ ঘটনার পর থেকেই একের পর এক বের হয়ে আসতে থাকে হাজী সেলিম ও তার পরিবারের অপরাধ-অপকর্মের ফিরিস্তি। আশিক টাওয়ারে সেলিমপুত্রের টর্চার সেলে নির্যাতনের কথাও জানান অনেকে।

সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন ও ব্যক্তি নিজেদের জমি বুঝে পেতে কাজ শুরু করে।

এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক ছিল সর্বাগ্রে। ইরফান গ্রেফতারের পর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার এলাকায় হাজী সেলিমের দখলে থাকা তাদের মালিকানাধীন ১৯ দশমিক ১৪ ডেসিমাল জমি উদ্ধার করে ব্যাংকটি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা ছাড়াই হাজী সেলিমের দেয়া সীমানা প্রাচীর ভেঙে দখলকৃত জমি বুঝে নেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

চলতি বছরের মে মাসে দখল হয়ে গেলেও এতদিন নিশ্চুপ ছিল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। যুগান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন অগ্রণী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আবদুস সালাম মোল্যা।

এরপরই আলোচনায় আসে বাকশ্রবণ প্রতিবন্ধী স্কুলের নামে বরাদ্দকৃত জমি দখলের বিষয়টি। যা হাজী সেলিমের দখলে ছিল বলে অভিযোগ বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থার।

অবৈধ দখলে থাকা এই জমিটিও হাজী সেলিমের হাতছাড়া হচ্ছে। জমির দখল আবারও স্কুলকে বুঝিয়ে দেয়া হবে বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন ঢাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. শহীদুল ইসলাম।

হাজী সেলিমের মালিকানাধীন মদিনা গ্রুপের ঢাকাস্থ দুটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবন হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করছে না।

চকবাজারের মদিনা আশিক টাওয়ার ও সেন্ট্রাল রোডের মদিনা স্কয়ারের কাছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) পাওনা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪২ লাখ ৪ হাজার টাকা।

অতীতে ডিএসসিসি পাওনা পরিশোধে তাগাদা দিলেও এ বিষয়ে জোর করতে সাহস করেনি। তবে ডিএসসিসি’র একটি সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, তারা এখন পাওনা টাকা বুঝে পেতে উদ্যোগ নিচ্ছেন।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম যুগান্তরকে বলেন, নৌবাহিনী কর্মকর্তাকে মারধর তো কেবল একটি ঘটনা।

হয়তো এর আগেও ভুক্তভোগীরা অনেক ঘটনার প্রতিবাদ করতে সাহস করেনি। আগে অন্যান্য কী ধরনের অপরাধ ইরফান ও তার সহযোগীরা করেছে তা নিয়েও আমরা কাজ করছি।

র‌্যাবের মুখপাত্র এবং আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। বিষয়গুলো আমাদেরও নজরে এসেছে।

তাদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

ডিএমপি’র চকবাজার জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. ইলিয়াছ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাদের ব্যবস্থা নেয়া হবে। যে কোনো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে আমরা দেখব।

তিনি জানান, অস্ত্র ও মাদক আইনে চার মামলায় ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ জাহিদের ১৪ দিন করে মোট ২৮ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছে চকবাজার থানা পুলিশ।

এমপি সেলিম ও তার ছেলে ইরফান সেলিমসহ পরিবারের সদস্যদের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ সময় অবৈধ সম্পদের মামলা করেছিল দুদক।

ওই মামলায় বিশেষ জজ আদালত হাজী সেলিমকে ১৩ বছরের সাজা দেন এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানা করেন। পরবর্তী সময়ে হাজী সেলিম ওই সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করলে বিশেষ জজ আদালতের সাজা থেকে খালাস পান।

দুদক ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বলেছেন, তাদের অবৈধ সম্পদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব দুদক আইনের তফসিলভুক্ত হলে তা নিয়ে অনুসন্ধান করা হবে।

এদিকে হাজী সেলিম ও তার পরিবারের মানি লন্ডারিংসহ আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

এ বিষয়ে বিএফআইইউ’র প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান যুগান্তরকে বলেন, সাধারণত কোনো আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেই আমরা সেটি তদন্ত করি। এই পরিবারের মানি লন্ডারিংসহ আর্থিক অনিয়ম নিয়ে আমরা কাজ করছি।

এছাড়া সেলিম পরিবারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সরকারের বার্তা হল- ‘অপরাধ করলে এমপি হলেও ছাড় নয়।’

ফলে ক্ষমতাসীন দলের থেকেও নিজের সাম্রাজ্য ও পুত্রকে বাঁচাতে কোনো ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছেন না হাজী সেলিম। এ বিষয়ে যুগান্তরকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যেই জড়িত থাকুক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

তাতে সে জনপ্রতিনিধি বা যত বড় শক্তিশালী লোকই হোক না কেন, ছাড় দেয়া হবে না। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অপরাধীকে আইনের মুখোমুখি হতেই হবে।’

রিমান্ডে ইরফান : ডিবি হেফাজতে তিন দিনের রিমান্ডে রয়েছেন ইরফান ও তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ জাহিদ। বৃহস্পতিবার দুপুরে তাদের ডিবি হেফাজতে আনা হয়। ডিবি সূত্র জানায়, শুরুতে ইরফানকে নির্ভার মনে হলেও শনিবার সে অনেকটাই ভেঙে পড়েছেন।

সে বুঝতে পেরেছে, ‘ক্ষমতা এখন শূন্য। সেই ক্ষমতা আর নেই।’ নৌবাহিনী কর্মকর্তাকে মারধরের মূল দায় চাপাচ্ছেন মদিনা গ্রুপের প্রটোকল অফিসার এবি সিদ্দিক দিপুর ওপর। ইরফানের দাবি, সে ঘটনা বুঝে ওঠার আগেই ‘এটা হয়ে গেছে’।

যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, দিপু অপরাধ করলে তাকে থামালেন না কেন- তখন তিনি অনেকটা নিশ্চুপ ছিলেন। এ ঘটনা ছাড়াও বিভিন্ন অপরাধ-অপকর্মে জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বেশির ভাগ ঘটনাই তার অগোচরে হয়েছে বা হয়নি বলে জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম যুগান্তরকে বলেন, রিমান্ডে ইরফানকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

নৌবাহিনী কর্মকর্তাকে মারধরের দায় অস্বীকার করে সহযোগীদের ওপর তিনি চাপাচ্ছেন। কাল (আজ রোববার) তার রিমান্ড শেষ হবে। এরপর আমরা আরও পাঁচ দিনের রিমান্ড চাইব।

তিনি আরও জানান, ইরফানের সহযোগী দিপুর রিমান্ড শেষ হলে পুনরায় পাঁচ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে তাকে ফের ডিবি হেফাজতে আনা হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: