শুক্রবার, ২২ জানুয়ারী ২০২১, ০২:০৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
শিরোনাম :
দুদকের মামলায় কারাগারে টেকনাফের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর সেন্টমার্টিন প্রবাল দ্বীপ ভ্রমণে পুলিশের মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ ভাসানচরে ঈদের আনন্দ, মেজবানের আয়োজন হাটহাজারীতে রেলওয়ের সম্পত্তি উদ্ধার করলেন উপজেলা প্রশাসন বান্দরবানে প্রথম দফায় ৩৩৯টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ঘর দেয়া হচ্ছে ইসলামাবাদে সড়ক দুর্ঘটনায় একজন নিহত আহত-১ মুজিববর্ষে জমিসহ ঘর পাচ্ছেন ৮৬৫ গৃহহীন, শনিবার হস্তান্তর করবেন প্রধানমন্ত্রী মহেশখালীর ভূমি অফিসের তহসিলদার জয়নাল দুদকের হাতে আটক উখিয়ায় শিক্ষকের বসতবাড়ীতে চুরি, নিয়ে গেছে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা বান্দরবানে চাঁদের গাড়ি খাদে পড়ে নিহত ৩, আহত ৫

ভাসানচরে ঘর দেখে রোহিঙ্গা শিশুদের মুখের হাসি ছিল অভাবনীয়

জাগো নিউজ:: / ২৫৭ বার
আপডেট রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০, ৫:২৮ অপরাহ্ন

সমাজকল্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থার (স্কাস) চেয়ারপারসন হিসেবে ২৭ বছর ধরে নারী ও শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন জেসমিন প্রেমা। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার দীর্ঘদিনের।

নোয়াখালীর ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের আবাসন প্রকল্প নিয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) বিরুদ্ধে যখন অপপ্রচারের অভিযোগ শোনা যায়, সেই সময় প্রেমার নেতৃত্বে ২২টি এনজিও কাজ শুরু করে সেখানে। ভাসানচরে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং দেশের নারী ও শিশুদের নিয়ে তিনি কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সিরাজুজ্জামান।

জাগো নিউজ : ভাসানচর নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছে। ষড়যন্ত্রের অভিযোগ শোনা যায় এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে। ছিল বিদেশি এনজিওগুলোর চাপ। এর মধ্যে আপনারা কেন ভাসানচরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন?

জেসমিন প্রেমা : ভাসানচরে যখন কেউ যেতে রাজি হচ্ছিল না তখন আমরা সেখানে যাওয়ার জন্য রাজি হই। এমনকি বিদেশি এনজিও রাজি ছিল না যে, আমরা ভাসানচরে যাই। কিন্তু আমরা দেশের স্বার্থে চ্যালেঞ্জ নিয়ে সেখানে গিয়েছি। আমাদের ইচ্ছা ছিল, কেউ যদি ফান্ড বন্ধ করে দেয়, তাও আমরা সেখানে যাব। আমরা দেশের স্বার্থটা বেশি চিন্তা করেছি।

আমাদের প্রতিষ্ঠানে অনেক কর্মী কাজ করেন, তাদের কী হবে সেটা একটা চিন্তার বিষয় ছিল। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার নিজেকে নিয়ে কোনো চিন্তা ছিল না। দেশের স্বার্থে এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ভাসানচরে গিয়েছি।

জাগো নিউজ : ভাসানচরে যাওয়ার আগে অনেক কথা শুনেছেন। অনেক অপপ্রচারও হয়েছে। যাওয়ার পর আপনারা কী দেখলেন?

জেসমিন প্রেমা : প্রথমত তাদের (অপপ্রচারকারীদের) কথা ছিল সেখানে যাওয়া যাবে না। তারা সেখানে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন না। ভাসানচরে গেলে পানিতে কিংবা সাগরে নিয়ে যাবে, সাগরে মানুষ ভেসে যাবে, সেখানে স্বাভাবিক জীবনযাপনের কোনো সুযোগ নেই বা সুযোগ থাকবে না। যদিও এটা (অপপ্রচার) কোনো মানবাধিকার সংগঠনের কাজ নয়, এ ধরনের অনেক কথা শুনতে হয়েছে আমাদের। অনেকেই বলেছেন, সরকার এটা নিয়ে বিজনেস করার জন্য এ ধরনের প্রকল্প নিয়েছে—এসব কথাবার্তা ছিল। সেই জায়গা থেকে চ্যালেঞ্জ নেয়ার বিষয়টি ছিল। কিন্তু নিজের একটা দায়িত্ববোধ, কর্তব্য এবং দেশের ক্রাইসিসের কথা ভেবে সেখানে আমি গিয়েছি।

জাগো নিউজ : এর আগেও তো কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করেছেন। ভাসানচরের সঙ্গে এর পার্থক্য কী?

জেসমিন প্রেমা : পরের বার যখন রোহিঙ্গারা আসেন তখন সব বড় বড় পাহাড় কেটে তাদের থাকার জায়গা করা হয়েছিল। তখন পাহাড়ে উঠে আমাদের কাজ করতে হতো। প্রথমবার যখন আমি উঠতে যাই, আমার মনে আছে পাহাড়ে উঠে আমি পড়ে গিয়েছিলাম এবং আধঘণ্টা শুয়ে ছিলাম। পাহাড়ে ওঠা এত কষ্টকর ছিল। তারপর সে পাহাড়ে ঘর ভেঙে দেয়া হলো। এভাবে আমাদের কাজ করতে হয়েছে। কিন্তু সে দিক দিয়ে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য উন্নত জীবনযাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিজের তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্পটি করা হয়েছে। সেফটি ও সিকিউরিটির কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী টাইম টু টাইম ফলোআপে রাখেন। এটা আমাদের কাছে বেশি ভালোলাগা এবং ভালোবাসার জায়গা। যেটা শক্তি জুগিয়েছে সেটা হলো—ভাসানচর প্রকল্পে নিঃসন্দেহে মানবিক দিকটা চিন্তা করা হয়েছে।

জাগো নিউজ : স্কাসের হয়ে আপনারা কক্সবাজারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন এবং করোনাকালেও কাজ করেছেন। আপনার এই কাজের কিছু অভিজ্ঞতা যদি বলেন…

জেসমিন প্রেমা : করোনাকালের শুরুর দিকে সব মানুষ যখন ঘরে, তখন আমি কক্সবাজারের উখিয়ায় কাজ করেছি। সেই সময় জেলা প্রশাসক, ইউএনওসহ অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেছি, কথা বলেছি। কাজ করেছি, মাঠে গিয়েছি। তখনো আমি চ্যালেঞ্জ নিয়েই কাজ করেছি। আমি ভেবেছি যদি এই করোনাকালে কাজে আসতে পারি তাহলে আমার জীবনটা সার্থক হবে—এটাও ভেবেছি। সেভাবে আমি সব লেভেলের প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করেছি। কোনো এনজিও সে সময় অ্যাক্টিভ ছিল না। অনেকে বাসায় থেকে অফিস করেছে।

আমি কক্সবাজারের জেলা প্রশাসককে ধন্যবাদ জানাবো, উনি সেই সময় কাজ করার জন্য যথেষ্ট সাহস এবং অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। সে সময় সেখানকার ব্যাংক তিন মাস বন্ধ ছিল। আমার স্টাফদের স্যালারি দিতে পারছিলাম না। সেই সময় জেলা প্রশাসককে বলে তাদের স্যালারির ব্যবস্থা করি।

আমি অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি এবং চেষ্টা করি যেন সে কাজটা ভালো হয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমরা ততটা স্বাধীন হতে পারিনি। কারণ সামাজিক-পারিবারিক মেন্টাল টর্চারটা বেড়ে যাচ্ছে। সেগুলো আমরা বলতে পারি না এবং অফিসেও অনেক ক্ষেত্রে আমরা ইনসিকিউরড ফিল করি। কর্মজীবী নারীদের বাসা এবং অনেক সময় অফিসের একটা প্রেসার থাকে। এই জায়গাগুলোতেও আমাদের এখন কাজ করতে হবে।

জাগো নিউজ : আপনার নেতৃত্বে ২২টি এনজিও ভাসানচরে গিয়েছে। এখনো অনেক এনজিও আছে, যারা শুধু কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জন্য কাজ করছে, কিংবা যেসব রোহিঙ্গা ভাসানচরে যেতে চাচ্ছে না তাদের সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে আপনার কোনো পরামর্শ আছে কি-না?

জেসমিন প্রেমা : আমি যখন ভাসানচরে গেলাম এবং রোহিঙ্গারা যেদিন গেল সেদিন ভীষণ আবেগাপ্লুত ছিলাম। কারণ প্রকল্পটি স্বপ্নের জায়গা। রোহিঙ্গারা সেখানে গিয়ে খুব খুশি ছিল। সেটা আমার বিশেষ ভালোলাগার ছিল।

রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত ঘর দেখে, পরিবেশ দেখে তাদের শিশুদের মুখে যে খুশি ছিল যেটা আমরা চিন্তাই করতে পারিনি। এই খুশি তাদের মধ্যে দেখব সেটা আসলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কারণে। সেদিক থেকে ভাসানচর সাকসেসফুল প্রকল্প। ২২টি এনজিওর মধ্যে আমি একমাত্র নারী সেখানে কাজ করেছি।

সেখানে কাজ করতে গিয়ে আমাকে অনেক চ্যালেঞ্জ ফেস করতে হয়েছে। তবে সেখানকার নৌবাহিনীর সদস্যরা আমাকে যথেষ্ট টেক-কেয়ার করেছেন। সরকারের বিভিন্ন এজেন্সিও আমাকে সাহায্য করেছে এবং আমার এনজিওর অন্য কলিগরা আমাকে সাপোর্ট করেছেন। যখন আমি ওই জায়গায় কাজ করছিলাম, তখন এটা ভালো লাগছিল যে—অনেকেই তাদের পরিবারের সদস্যদের ভিডিও করে আমাকে দেখিয়েছেন। তারা তাদের পরিবারের সদস্যদের বলেছেন—দেখ আপা কাজ করেছেন। সব ছেলে মানুষের মধ্যে আমি একমাত্র নারী। কিন্তু আমি কখনোই ভাবিনি—আমি একজন নারী। আমি সবসময় ভাবতাম আমি একজন মানুষ। সেটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

জাগো নিউজ : স্কাসের হয়ে আপনি কত বছর ধরে কাজ করছেন?

জেসমিন প্রেমা : আমি ২৭ বছর ধরে কাজ করছি। আমি আমার এই স্কাসের মধ্যেই বেঁচে থাকতে চাই। সরকারের কাছে আমাদের দাবি থাকবে, যে এনজিওগুলো সেখানে প্রথমে কাজ করতে গেছে, তাদের যেন সব বিষয়ে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। সরকারের কাছে আমাদের বিনয়ের সঙ্গে দাবি কিংবা আবেদন, আমরা স্কাসসহ যে ২২টি এনজিও সেখানে প্রথম কাজ শুরু করেছি তাদের যেন মূল্যায়ন এবং সহযোগিতা করে।

আমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কক্সবাজার, ফেনী, খুলনা, রাজশাহীসহ মোট ১৩টি জেলায় কাজ করছি। প্রায় ৬০০ জন স্টাফ সারাদেশে নারী ও শিশুর উন্নয়নে কাজ করছি।

জাগো নিউজ : এনজিও করার চিন্তা করলেন কীভাবে?

জেসমিন প্রেমা : আমি আগে তিন মাস পরপর ব্লাড দিতাম এবং অনেক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। সে সময় একজন পরামর্শ দিয়েছিলেন সমাজের দুস্থ নারী-শিশুদের নিয়ে কাজ করার জন্য এনজিও গঠন করো। এরপর থেকে আমি এনজিও গঠন করি। আমি অনেক আগে থেকেই কবিতা লিখতাম, অভিনয় করতাম, মঞ্চনাটক করতাম। সে সময়কার বড় বড় কবি লেখকদের সঙ্গে আমার চেনাজানা ছিল। শামসুর রাহমান, হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ূন আহমেদ স্যারের সঙ্গে আমার বেড়ে ওঠা।

যখন তিন মাস পরপর ব্লাড দিতাম তখন আমি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লাম। তখন সেই সময় একজন কবি আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন এভাবে এলোমেলো ব্লাড না দিয়ে একটা সংগঠন করো, যার মাধ্যমে তুমি অনেক মানুষের সেবা করতে পারবে। এভাবেই আমার এনজিও গঠন করা শুরু। আমার বাবা আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন কীভাবে কাজ করতে হবে। আমি বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে ভলান্টিয়ার থাকার সময় থেকেই স্কাসটাকেও একটু একটু করে ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত করার পর কাজ শুরু করি। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা ও ড. রাজীব হুমায়ুন স্যারও আমাকে যথেষ্ট সাপোর্ট দিয়েছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: