সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ০১:০১ অপরাহ্ন

সমন্বয়ে জাতীয় কমিটি গঠন

বাড়ছে রোহিঙ্গাদের অপরাধ

যুগান্তর:: / ১০৭ বার
আপডেট সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ০১:০১ অপরাহ্ন
রোহিঙ্গাদের অপরাধ
বাড়ছে রোহিঙ্গাদের অপরাধ

# ১২ অপরাধে মামলা ৭৩১, আসামি ১৬৭১ রোহিঙ্গা

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা নাগরিকদের অপরাধের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের এসব নাগরিক কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে অর্থ লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। অনেকেই অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়েছে। প্রশাসনের অগোচরে ক্যাম্পে বিভিন্ন ধরনের কমিটি করছেন রোহিঙ্গারা। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। রাতে ক্যাম্পে কি ঘটছে তার খবর পাচ্ছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সার্বিক কার্যক্রম সমন্বয় করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছে সরকার। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

সূত্র আরও জানায়, রোহিঙ্গারা যেন ভাসানচরে না যায়, সেজন্য কিছু এনজিওসহ একটি মহল চক্রান্ত করছে বলেও সরকার তথ্য পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সম্প্রতি দুটি বৈঠকে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।

এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, আইনশৃঙ্খলাসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আনতে সমন্বিতভাবে একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন- কারা, কেন রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে তার খোঁজ নেয়া হচ্ছে। সেখানে কর্মরত এনজিওগুলোর কার্যক্রম মনিটর করার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এছাড়া ভাসানচরে থানা স্থাপন করা হবে। থানার পাশাপাশি সেখানে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ও (আরআরআরসি) খোলা হয়েছে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ বছরে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে ১২ ধরনের অপরাধে কমবেশি ৭৩১টি মামলা হয়েছে। যাতে আসামি হয়েছেন ১ হাজার ৬৭১ জন রোহিঙ্গা। এসব অপরাধের মধ্যে আছে- অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, অপহরণ, বিশেষ ক্ষমতা আইন, পুলিশ আক্রান্ত, ডাকাতি বা ডাকাতির প্রস্তুতি, হত্যা, মানব পাচার ইত্যাদি। এর মধ্যে ৫৩টি খুন, ৪১০টি মাদক, ২৮টি মানব পাচার, ৫৯টি অস্ত্র, ৩৫টি ধর্ষণ ও ১০টি ডাকাতি এবং ১৬টি অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মামলা উল্লেখযোগ্য। ২০১৭ সালে নানা অপরাধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল ৭৬টি আর আসামি হন ১৫৯ জন। ২০১৮ সালে ২০৮ মামলায় আসামি ৪১৪ জন। ২০১৯ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৬৩টি আর আসামি হন ৬৪৯ জন। চলতি বছরের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গা অপরাধীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ১৮৪ মামলায় আসামি ৪৪৯ জন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রোহিঙ্গারা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। ক্যাম্পে কয়েকটি গ্রুপ মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা মিয়ানমার থেকে সরাসরি ইয়াবার চালান এনে ক্যাম্পে মজুদ রাখেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ির মধ্যেও ক্যাম্পে ইয়াবার চালান, মজুদ এবং লেনদেন করছেন। কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ায় অপরাধীরা সেখানে অবস্থানের সুযোগ পাচ্ছে। সেখানে যখন-তখন অভিযান চালানো সম্ভব হয় না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে। এ সুযোগে ক্যাম্পে ঘটছে অপরাধ। অধিকাংশ ক্যাম্প পাহাড়সংলগ্ন হওয়ায় কয়েকটি ডাকাত দলের অপরাধ কর্মকাণ্ডও বেড়েছে। ফলে ক্যাম্প অপরাধীদের জন্য নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ইয়াবার মজুদ ও লেনদেনের জন্য ক্যাম্পগুলো ব্যবহার করছে অপরাধীরা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আশ্রিত রোহিঙ্গারা মাদক, অস্ত্র চোরাচালান ও মানব পাচারসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন বাহিনী গড়ে ওঠা ও সাম্প্রতিক নাশকতামূলক কার্যক্রম ঠেকাতে দায়িত্বরত নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রমে ঘাটতি পেয়েছে সরকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসব ঘাটতি দূর করার তাগিদ দেয়া হয়। এরপর বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন কার্যক্রম মনিটরিং এবং এনজিওগুলোর বিষয়ে তদন্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রশাসনের অগোচরে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে নানারকম অপরাধ সংঘটিত করছে। এগুলো বন্ধ করতে হবে।

১২ অক্টোবর ভোরে টেকনাফের শামলাপুরের জলসীমানায় ঢুকে জেলেদের অপহরণের চেষ্টাকালে মিয়ানমারের ডাকাতসহ ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় তাদের কাছে ৪টি অস্ত্র পাওয়া যায়। এছাড়া চলতি মাসের ১-১২ অক্টোবর পর্যন্ত কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পসহ পাহাড়ি এলাকা থেকে পিস্তলসহ ২১টি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র এবং অর্ধশতাধিক গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময় রোহিঙ্গাসহ ৪০ জন ডাকাতকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুই থানায় ৭টি মামলা করা হয়েছে। কিন্তু এ বছরের ৯ মাসে এসব এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল ৯০টি। এ পরিসংখ্যান হিসাব করলে বোঝা যায় ক্যাম্পে বর্তমানে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তাসহ বেশকিছু বিষয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ক্যাম্পের চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ, গত দুই অর্থবছরে (২০১৯-২০ ও ২০২০-২১) ২৬৫ কোটি টাকা ছাড়করণ, প্রয়োজনীয়সংখ্যক ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ, সিসি ক্যামেরা স্থাপন, বেষ্টনীর চারপাশে টহলে রাস্তা নির্মাণ করা হবে। ক্যাম্পের ভেতরে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের যৌথ ক্যাম্প স্থাপনের পাশাপাশি রোহিঙ্গারা যাতে অস্ত্র ও মাদকের ব্যবসা না করতে পারে সেজন্য যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রাখা হবে। রোহিঙ্গারা যাতে বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিতে না পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানের অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ধরে ধরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে না পাঠিয়ে ভাসানচর ক্যাম্পে পাঠানো হবে।

জানা গেছে, স্বাধীনতার আগে থেকেই রোহিঙ্গাদের অনেকের এ দেশে ব্যবসায়িক সূত্রে আসা-যাওয়া ছিল। তবে সামরিক নিপীড়ন শুরু হওয়ায় আশির দশক থেকেই হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পাড়ি জমাতে থাকেন। বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় ৩৪টি স্বীকৃত ক্যাম্পে ১১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার বাস। বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে কক্সবাজার। যা বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলেই মনে করছে সরকার ও বিশেষজ্ঞ মহল। মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দেয়া হলেও তারাই এখন হয়ে উঠেছে সরকারের মাথাব্যথার কারণ। এরা নষ্ট করছে উখিয়া-টেকনাফের শান্তিময় পরিবেশ। গোলাগুলি ও হামলায় প্রায় মাসেই রক্তাক্ত হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর পরিবেশ।

সূত্র জানায়, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে ফিরিয়ে নেয়ার পর সেখানে একটি থানা স্থাপন করা হবে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের নির্দেশনা পাওয়ার পর কাজ শুরু করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর আগে গত বছরের ২১ অক্টোবর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) বৈঠকে নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরে নতুন থানার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বছরখানেক আগে ভাসানচর এলাকা ঘুরেও এসেছেন। এরই মধ্যে সরকার সাগরবর্তী এ বিস্তীর্ণ চরটির উন্নয়নে ২৮ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। নৌ বাহিনীর তত্ত্বাবধানে এ চরটির উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: