বুধবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২১, ০৭:৩৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
শিরোনাম :
উখিয়ার সাবেক ইউএনও গোলামুর রহমান আর নেই কক্সবাজার র‌্যাবের অভিযানে বিদেশী মদ,বিয়ার, ফেন্সিডিলসহ এক মাদককারবারি গ্রেফতার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রনালয় অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন উখিয়ায় নির্মাণাধীন সরকারি প্রকল্পে বাঁধা, উত্তেজনা উখিয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি নির্মাণে বাধা, শিক্ষক ও অভিভাবকদের ক্ষোভ ঋণ পরিশোধ না করায় জেলে মায়ের সঙ্গী এক বছরের শিশু উখিয়ায় আলীশান বিয়ের আয়োজন করে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা পাচার উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসী দু’গ্রুপের গোলাগুলিতে নিহত ১ রাইজিং কক্স’র নির্বাহী সম্পাদক কালাম আজাদের জন্মদিন পালিত উখিয়া অনলাইন প্রেসক্লাব’র ক্রীড়া উপ-কমিটি গঠিত

থামছেই না ইয়াবা প্রবেশ: অধরা নেপথ্যের নায়করা

নুরুল করিম রাসেল:: / ১৪৯ বার
আপডেট শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২০, ২:৪৭ পূর্বাহ্ন

#শুধু টেকনাফ সীমান্তে সাড়ে ৭ মাসে জব্দ ৩২ লাখ ৮৬ হাজার ইয়াবা * জব্দ হচ্ছে ৪ ভাগের ১ ভাগ * জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সীমান্তে নিশ্ছিদ্র প্রহরা, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত বন্ধ এবং যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা পদক্ষেপের পরও থামছে না ইয়াবা প্রবেশ। এর উৎসভূমি মিয়ানমার থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া এবং বান্দরবান সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে ভয়াবহ এ মাদক। এছাড়া বঙ্গোপসাগর হয়ে উপকূলীয় বিভিন্ন সীমান্ত দিয়েও আসছে ইয়াবার চালান। এসব অঞ্চলে ৩ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে মাদকবিরোধী অভিযান। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তালিকাভুক্ত এবং এর বাইরে থাকা মাদক কারবারিরা আটক হয়েছে। কিন্তু অধরা থেকে যাচ্ছে অধিকাংশ ইয়াবার নেপথ্য নায়করা। নানা কৌশলে তারা মাদকের এ অবৈধ ব্যবসা জিইয়ে রেখেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিমত, শুধু অভিযানেই বন্ধ হবে না মাদক প্রবেশ। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অভিযানের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সীমান্তে নিশ্ছিদ্র প্রহরা, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত বন্ধ, মাদকের চাহিদা হ্রাস, মাদকসেবীদের পুনর্বাসনসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া একক কোনো বাহিনীকে দায়িত্ব না দিয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান পরিচালনা করলে মাদক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তারা।

২০১৭ সালের মে মাসে মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স (শূন্য সহিষ্ণুতা) ঘোষণার পর দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান শুরু হলে বন্দুকযুদ্ধে অনেক মাদক কারবারি নিহত হন। কিন্তু মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে টেকনাফসহ সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদকের পাচার এখনও অব্যাহত। এছাড়া দুই দফায় ১২৩ মাদক কারবারি আত্মসমর্পণ করলেও পুরোপুরি সুফল আসেনি। প্রতিদিন যেসব মাদকের চালান ঢুকছে, তার ৪ ভাগের ১ ভাগ জব্দ হচ্ছে। বাকি ৩ ভাগই দেশের অভ্যন্তরে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বিজিবির হিসাব মতে, জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত টেকনাফ সীমান্তে ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের জওয়ানরা ৩২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০ পিস ইয়াবা জব্দ করেছে। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৬৮ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৫১ জন রোহিঙ্গা ছিল। এতে ২৬ জন সক্রিয় ডাকাত ছিল। বাকিরা মাদক কারবারি। এর আগে ২০১৮ সালের মে থেকে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযান ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় ৫৬ রোহিঙ্গাসহ ২০৯ জন নিহত হন। কক্সবাজার জেলায় মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত ২৭৭ জন মারা গেছেন।

টেকনাফ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক সিরাজুল মোস্তফা বলেন, বন্দুকযুদ্ধ মাদক নির্মূলের কোনো সমাধান হতে পারে না। মাদক নির্মূল করতে গেলে সবার আগে প্রয়োজন স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা। যদি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর লোকবল সংকট থাকে, তাহলে অন্যান্য বাহিনীর সহযোগিতা নিতে পারে। তবে মাদক প্রতিরোধে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করলে একটা স্বচ্ছতা থাকবে এবং মাদক পাচার ৯০ শতাংশ কমে আসবে। টেকনাফ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বিগত ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছর আগস্ট পর্যন্ত ডিএনসি ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৩১১ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে।

মাদক নিরাময় কেন্দ্র কক্সবাজার ফিউচার লাইফের নির্বাহী পরিচালক জসিম উদ্দিন কাজল বলেন, শুধু মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে সীমান্তে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার পাশাপাশি মাদকের চাহিদা হ্রাস করতে হবে। মাদকসেবীদের নিয়ে ব্যাপক আকারে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কাজ করতে হবে। যারা মাদকসেবী আছে তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন করতে হবে। তরুণরা যাতে মাদকে জড়িয়ে না পড়ে সে ব্যাপারে অভিভাবক পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মাদকের কুফল সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা গ্রহণ করতে হবে। টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখছি মাদকবিরোধী অভিযানের নামে কী হচ্ছে। মাদক পাচার ও ব্যবহার ঠিকই থেকে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি মাদকবিরোধী অভিযানকে পুঁজি করে যা ইচ্ছে তাই করছে, যা ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি। কাজেই সরকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে মাদকবিরোধী ‘মাস্টার প্ল্যান’ সাজাতে হবে।

মাদক পাচার কেন বন্ধ হচ্ছে না জানতে চাইলে টেকনাফ বিজিবি ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ ফয়সল হাসান খান জানান, বিজিবি সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাদক পাচার বন্ধসহ সীমান্ত সুরক্ষায় দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন, তারপরও মাদক পাচার হয়ে আসছে। তার মতে, মাদক পাচার বন্ধ করতে হলে প্রথমত মাদকের মূল নিয়ন্ত্রক যারা, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সিন্ডিকেটগুলো খুঁজে বের করতে হবে। মাদকের লেনদেন কীভাবে হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। যারা সেবনকারী আছে, তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। নতুন সেবনকারী যাতে বৃদ্ধি না পায়, এ ব্যাপারে কাজ করতে হবে। মাদক পাচারে রোহিঙ্গারা একটা বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করে তিনি এদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেন। ৩ বছরের মাদকবিরোধী অভিযানে দেশীয় মাদক ব্যবসায়ী কমলেও রোহিঙ্গা কারবারি, পাচারকারী, বহনকারী বৃদ্ধি পেয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন সংস্থার তালিকায় কক্সবাজার জেলার ১ হাজার ১৫১ ইয়াবা ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪ ব্যক্তিকে গডফাদার (নেপথ্যের নায়ক) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতজন ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন। আত্মসমর্পণ করেছেন ২৩ জন। তারা কক্সবাজার জেলখানায় আছেন। তাদের অনেকে সেখানে বসে আত্মীয়স্বজন এবং তাদের নিয়োজিত মাদক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাকি ২৪ জন গডফাদার বহাল তবিয়তে আছেন। তারা একরকম ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের অনেকেই ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।

আরও জানা গেছে, সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর যেসব মাদক ব্যবসায়ী আত্মগোপনে ছিল, তাদের অনেকে এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। পুরনো গডফাদারদের পাশাপাশি সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন গডফাদার। যাদের নাম কোনো তালিকায় নেই।

এছাড়া ইয়াবার অর্থের লেনদেনে যারা জড়িত, সেই হুন্ডি সিন্ডিকেট এত অভিযানের পরও নিরাপদেই রয়েছে। হুন্ডি সিন্ডিকেটের শীর্ষ ব্যক্তি টিটি জাফরের নেতৃত্বে দুবাই সৌদি আরব-মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর-মিয়ানমার ভিত্তিক প্রায় শতাধিক হুন্ডি কারবারির সিন্ডিকেট ইয়াবার অর্থ লেনদেন করে থাকেন।

টেকনাফের যেসব পয়েন্টে ইয়াবার চালান : স্থানীয়দের মতে, টেকনাফের যেসব পয়েন্ট দিয়ে এখনও ইয়াবার চালান পাচার হয়ে আসছে সেসব পয়েন্ট হচ্ছে- শাহপরীর দ্বীপে ঘোলার চর, জালিয়াপাড়া, পশ্চিমপাড়া, ভাঙ্গারমুখ, সাবরাংয়ের খুরের মুখ, নয়াপাড়া, আছারবনিয়া, মগপাড়া, আলুগোলার তোড়া, সিকদার পাড়া, সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, নাইট্যংপাড়া, রাশিয়ান ফিশারি, তুলাতলী ঘাট, মহেশখালীপাড়া, লম্বরী ঘাট, হাবিরছড়া, রাজারছড়া, পৌরসভার কায়ুকখালীপাড়া, কেরুনতলী, হাঙ্গার ডেইল, ট্রানজিট জেটি, হ্নীলার দমদমিয়া, দক্ষিণ জাদিমোরা ওমর খাল, জাদির তলা, ব্রিটিশপাড়া, জাইল্যাঘাট, নয়াপাড়া, মোচনী, পূর্ব লেদা, বৃহত্তর আলীখালী, রঙ্গিখালী, চৌধুরীপাড়া, নাটমোরাপাড়া-জালিয়াপাড়া, জেলেপাড়া, পূর্ব ফুলের ডেইল, সুলিশপাড়া, হোয়াব্রাং, মৌলভী বাজার, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাংখালী, নয়াবাজার, মিনাবাজার-ঝিমংখালী, নয়াপাড়া, কাঞ্জরপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, ঊনছিপ্রাং, লম্বাবিল, হোয়াইক্যং পূর্বপাড়া, কোনারপাড়া, বালুখালী, খারাইগ্যাঘোনা, ঊলুবনিয়া ও কাটাখালী।

@যুগান্তর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: