মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৯:৪৫ পূর্বাহ্ন

উখিয়া-টেকনাফবাসীর কপাল পুড়েছে রোহিঙ্গায়

তোফায়েল আহমদ: / ১৩৬ বার
আপডেট মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৯:৪৫ পূর্বাহ্ন
উখিয়ার ১৭ নং রোহিঙ্গা শিবিরের একাংশ

কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উখিয়া-টেকনাফবাসীর কপাল পুড়েছে রোহিঙ্গায়। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের তিন বছরের প্রতিক্রিয়ায় এক বাক্যের এ কথাটি মানুষের মুখে মুখে। সাড়ে পাঁচ লাখ বাসিন্দার এই সীমান্ত জনপদের আগামী প্রজন্ম শিক্ষা-দীক্ষায় ৫০ বছর পিছিয়েছে-এমন উদ্বেগটিই স্থানীয় বাসিন্দাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। সীমান্ত জনপদের একজন মেধাবী সন্তান মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মতো শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তার পদ থেকে সাম্প্রতিককালে অবসরে গেছেন। আর সেই জনপদের মানুষগুলোই এখন তাদের সন্তানদের পড়ালেখা নিয়ে মস্তবড় ভাবনায় পড়েছে।

খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো এখন মুখ্যত টাকার এক ধরনের বড় উৎস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। টাকার অন্যতম উৎস হচ্ছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো-এনজিও। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছুটছে এনজিওর পেছনে। এনজিওতে চাকরি যেমনি রয়েছে, তেমনি রয়েছে ঠিকাদারি ব্যবসাও। তাই শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলেও পাঠ গ্রহণ বাদ দিয়ে দিনের সময়টি কাটিয়ে আসছে এনজিওতে। যে শিক্ষার্থী মাসে ৫০০ টাকা খরচের টাকা পায়নি, সে এখন প্রতি মাসে পাচ্ছে সর্বনিম্ন ১৫ হাজার টাকা।
তদুপরি বন্ধুবান্ধবীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার এক ভিন্ন পরিবেশ এসব শিক্ষার্থীদের টেনে নিচ্ছে এক আলাদা জগতে। ফলে লেখাপড়া লাটে উঠেছে। কক্সবাজারের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী জনপদের অন্যতম বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উখিয়া ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক অজিত দাশ এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানান, গেলবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ৫৬৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১৬৯ জন পাস করেছে। শতকরা ৩০ জন পাসের হারের কলেজটিতে তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্ট-পরবর্তী রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আগে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাসের হার ছিল এর চেয়ে তিন গুণেরও বেশি। একমাত্র রোহিঙ্গা এনজিও এলাকার লেখাপড়ায় মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলেছে- বলেন অধ্যাপক অজিত দাশ।

টেকনাফের সাগরপারের শামলাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিরও অনেক শিক্ষার্থী পড়ালেখা বাদ দিয়ে ঢুকে পড়েছে এনজিওতে। এমনকি দশম শ্রেণির একজন ছাত্র পাশের রোহিঙ্গা শিবিরের এক রোহিঙ্গা কিশোরীর সঙ্গে প্রেমে পড়ে রীতিমতো পড়ালেখাও ছেড়ে দিয়েছে। এমন সব চিত্র তুলে ধরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এম এ মঞ্জুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা শিবিরের এনজিওগুলোর টানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক মেধাবী ছাত্র পর্যন্ত পড়ালেখা বাদ দিয়ে মাসিক বেতন গুনছে। এভাবে টাকার লোভে পড়ে উখিয়া-টেকনাফের শিক্ষা-দীক্ষা পিছিয়ে পড়েছে ৫০ বছর।’

শিক্ষক এম এ মঞ্জুর আরো বলেন, শুধু উখিয়া-টেকনাফ নয়, পুরো কক্সবাজার জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে লেখাপড়ায় রোহিঙ্গা এনজিওর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়ার বাসিন্দা অধ্যাপক আলমগীর মাহমুদ বলেন, একটি জাতির উত্থানের নেপথ্যে বড় সোপান হচ্ছে শিক্ষা। সেই শিক্ষায় এখন পেছনে টান পড়েছে। তার একমাত্র কারণ হচ্ছে রোহিঙ্গা।

তিনি বলেন, উখিয়ার মেধাবী সন্তান মোহাম্মদ শফিউল আলম মাত্র কয়েক মাস আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পদ থেকে অবসরে গিয়ে যোগ দিয়েছেন বিশ্বব্যাংকে। রোহিঙ্গার কারণে বর্তমানে লেখাপড়া যে অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, এই জনপদে এ রকম কোনো মেধাবী সন্তান কবে যে ফিরে আসবে, তা-ই এখন বলা মুশকিল।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবিরোধী আন্দোলনে ভাটা
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন নিয়ে এলাকার মানুষ বেশ সোচ্চার ছিল। প্রত্যাবাসনবিরোধী অন্দোলনের ব্যানারে স্থানীয় বাসিন্দারা নানা সময় প্রতিবাদ সমাবেশ-মানববন্ধন কর্মসূচিসহ নানা আন্দোলনও করেছে। কিন্তু এসব অন্দোলন কর্মসূচি এখন ঝিমিয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার দাবিতে গত কয়েক মাসেও কোনো কর্মসূচি পালনের তথ্যও কারো কাছে নেই। এ বিষয়ে এলাকার অনেকেরই মন্তব্য-আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিওগুলো অত্যন্ত কৌশলী ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে নানা সহায়তার হাত বাড়িয়ে অন্তত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দাবিতে কিছুটা হলেও নমনীয় করতে পেরেছে।

এ ব্যাপারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত উখিয়ার বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ সিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ এটা যেমন জানি, তেমনি তাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসনও বিলম্বিত হবে-এটাও আমাদের জানা। তাই প্রতিদিন মাইক নিয়ে রোহিঙ্গা হটাও বলে চিল্লাচিল্লি করেই বা কী আর লাভ হবে।’ তিনি বলেন, রোহিঙ্গায় এ সময়ে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়টি হচ্ছে- প্রশাসন আর এনজিওর মধ্যে গড়ে ওঠা ঐক্য।

নূর মোহাম্মদ সিকদার বলেন, দেশের আড়াই শ বছরের মূলধারার প্রশাসনিক ব্যবস্থা জেলা প্রশাসনকে বাদ দিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) এর আওতায় এনজিও ব্যবস্থাপনার যে কথাটি শোনা যাচ্ছে, তা হবে দেশের জন্য বড় ধরনের বিপত্তি। এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেন যে, রোহিঙ্গা এনজিওগুলো এত দিন ধরেই জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের তদারকিতে চলে আসছে।

সম্প্রতি আরআরআরসি অফিস থেকে এনজিও ব্যুরোর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত এনজিওগুলোর তদারকির দায়িত্ব তাদের (আরআরআরসি) কাছে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

রোহিঙ্গা শিবিরে বছরে জন্ম নিচ্ছে ৩০ হাজার শিশু
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি রোহিঙ্গা শিবিরে গড়ে বছরে জন্ম নিচ্ছে ৩০ হাজার ৪৩৮ জন শিশু। জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশনের (ইএনএইচসিআর) পপুলেশন সিট ও শিবিরের হেলথ সেক্টরের তথ্য এটি। এতে আরো বলা হয়েছে, গড়ে প্রতিবছর ৩৫ হাজার চারজন নারী গর্ভবতী হন। সেই হিসাবে গত তিন বছরে কমপক্ষে এক লাখ শিশু জন্ম গ্রহণ করেছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: