সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৩৮ পূর্বাহ্ন

গাড়ির চাকায় পিষ্ট ডাকাত সদস্যের লাশ সরানোর দৃশ্য দেখে ফেলায় খুন হলেন কণ্ঠশিল্পী জনি!

ডেস্ক রিপোর্ট: কক্সবাজার ভিশন ডটকম / ২৫১ বার
আপডেট সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৩৮ পূর্বাহ্ন

শিশু শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া কক্সবাজারের জনপ্রিয় আঞ্চলিক গানের শিল্পী জনি দে রাজকে কেন খুন করা হলো- এই প্রশ্ন এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে এখনও জনমনে। তবে মিলছে না এই রহস্যের কুল-কিনারা! তরুণ এই কণ্ঠশিল্পী কী পরিকল্পিত খুনের শিকার নাকি নিছকই ডাকাতির ঘটনা, সেই রহস্যও বের করা যাচ্ছে না। হত্যার ৪ দিন পরও খুনিদের একজনও গ্রেপ্তার হয়নি। তবে হত্যা মামলার সুত্র ধরে কাজ করছে আইন শৃংখলা বাহিনীর একাধিক টিম।

অপরদিকে কণ্ঠশিল্পী জনি দে রাজের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় চলছে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ। তারপরও কোন সংস্থাই এখনও জনি হত্যার কোন কুল-কিনারা করতে পারেনি।

তবে কক্সবাজার থেকে প্রকাশিত একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের ঈদগাঁওর এক সাংবাদিক শিল্পী জনি দে রাজের জন্মস্থান ঈদগড় ঘুরে এসে একটি ‘লোমহর্ষক’ তথ্য উদঘাটন করেছেন। ওই সাংবাদিক তার পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি যাত্রী, চালক, পথচারী, প্রত্যক্ষদর্শীসহ বিভিন্নজনের সাথে কথা বলেন।

ওই প্রতিবেদকের মতে, বিভিন্ন সূত্র থেকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও মূলত কণ্ঠশিল্পী জনি দে রাজকে হত্যা করা হয়েছে ‘তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ পরায়ন’ হয়ে।

জনিকে বহনকারি সিএনজির আগে আরও একটি সিএনজি ঈদগড়ে যাচ্ছিল। সেই গাড়ীর এক যাত্রী প্রকাশ করেন অজানা কিছু তথ্য।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিকে তিনি ঘটনাটি জানান। তাদের একজনের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ওই ব্যক্তি প্রত্যক্ষদর্শী সেই সিএনজি যাত্রীর বরাত দিয়ে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরেন।

কি আছে সেই তথ্যে
ঘটনার দিন সকাল ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে ঈদগাঁও বাসস্টেশন থেকে ৫ জন যাত্রী নিয়ে ঈদগড়ের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় দিনের প্রথম সিএনজি গাড়ীটি। এই সিএনজি যাওয়ার পথে ঘটনাস্থলে পৌঁছলে একজন ব্যক্তি গাড়ীটিকে থাকতে সংকেত দেন। সেই সিএনজি চালক ডাকাত সন্দেহ করে ওই ব্যক্তিকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। যদিও এই ধরণের কোন ঘটনা সিএনজি চালক ও মালিক সমিতি বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। কারণ, সকাল ৮টার আগে ঈদগড় সড়কে সিএনজি ছেড়ে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আইনী ঝামেলা এড়াতে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন।

ওই ব্যক্তির মতে, প্রথম সিএনজির পরপরই আরও একটি সিএনজি ঈদগড়ে যাচ্ছিল, সেই গাড়ীর চালক ছিলেন ইসলামাবাদ ইউনিয়নের খোদাইবাড়ি এলাকার আবুল কালাম। এই গাড়ীটি যাওয়ার পথে সড়কের হিমছড়ি ঢালায় এক ব্যক্তি মুমূর্ষু অবস্থায় পড়েছিল। দ্বিতীয় গাড়ীর চালক পুরাতন অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সেও ডাকাত দলের সদস্যকে পিষে দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পথে গাড়ীটি পার্শ্ববর্তী বালির স্তূপে উল্টে যায়। ৫/৬ মিনিট পর্যন্ত গাড়ীর নিচে আটকা পড়েছিলেন যাত্রীরা। বালি উত্তোলনের এক শ্রমিকের সহযোগিতায় কোন রকম উঠে তারাও নিরাপদে চলে যান। এ সময় ডাকাত দলের অপরাপর ৫/৬ জন সদস্য পাহাড় থেকে নেমে এসে তাদের সহযোগীকে উদ্ধার করে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। ওই সময়েই যাচ্ছিল শিল্পী জনি দে রাজ ও মোহাম্মদ কালুকে বহনকারি সিএনজিটি। তাদের সিএনজিকেও থামতে সংকেত দেয় ডাকাত দল। তারা ইশারা দিয়ে ওদিকে না যাওয়ার জন্য বারণ করলেও জোরে চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে চালক। সংকেত অমান্য করায় এক রাউন্ড গুলিও করে ডাকাত দলের সদস্যরা। সংকেত ও গুলিবর্ষণ অমান্য করে তাদের সহকর্মীকে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর সময় নিহত কন্ঠশিল্পী জনি দে রাজ উঁকি দিয়ে তাদের কর্মকান্ড এক নজর দেখে নেন।

এ সময় উত্তেজিত ডাকাত দলের সদস্যরা সিএনজি চালককে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করে উপর্যুপরি চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কোপাতে থাকে। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে কোপ লেগে ঘটনাস্থলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন কণ্ঠশিল্পী জনি দে রাজ ও অপর যাত্রী মোহাম্মদ কালু। সে সময় তিন নারী যাত্রীকে নিয়ে চালক দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে গজালিয়া জামে মসজিদের পাশে কবরস্থানে অবস্থান নেন।

নারী যাত্রীদের ধারণা, জনি দে রাজ উঁকি দেয়ায় তাকে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে আহত করে ডাকাত দলের সদস্যরা। তাকে উদ্ধার করতে নেমে যান বৃদ্ধ মোহাম্মদ কালু।

মোহাম্মদ কালু ডাকাত দলের সদস্যদের কি যেন একটা কথা বলছিল, তাই তাকেও কোপানো হয়। তাদের ধারণা, ডাকাত দলের এক সদস্যকে সিএনজির ধাক্কা ও পিষ্ট করে মেরে ফেলায় তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে জনি দে রাজ ও কালুকে কুপিয়ে বদলা নেয়া হয়েছে। তা নাহলে জনি দে রাজের হাতে দামী দুইটি মোবাইল সেট, স্বর্ণের চেইনসহ আরও দামী জিনিসপত্র ছিল। সেগুলো কিছুই নিয়ে যায়নি ডাকাত দল। সে সময় ডাকাত দলের সদস্যদের উত্তেজিত অবস্থায় দেখা গেছে।

জনি ও কালুকে কুপিয়ে ডাকাত দলের পিষ্ট হয়ে মারা যাওয়া সদস্যকে টানাহেঁচড়া করে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যায়।

স্থানীয় লোকজনের দাবি, ঘটনাস্থলের আশপাশে জঙ্গলের দিকে ১/২ কিলোমিটার পথ বা স্থানে অভিযান চালালে ডাকাত দলের কোন না কোন আলামত সংগ্রহ করতে পারতো আইন শৃংখলা বাহিনী।

ঈদগড়ের বাসিন্দা আবুল কাসেম জানান, যদি ঘটনা এমনই হয়, তাহলে ডাকাত দলের সদস্য যে মারা গেছে তার লাশ পাহাড়ের ভিতর লুকিয়ে রাখতে পারে। সন্ধান চালালে তাদের কোন বস্তু আলামত হিসেবে উদ্ধার হতে পারে।

তবে এ পর্যন্ত পুলিশ ঘটনাস্থল ছাড়া আশেপাশে প্রবেশ করেনি। মামলার সূত্র ধরে পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে জড়িতদের ধরতে কাজ চালাচ্ছে। ঘটনার পরদিন থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক টিম কাজ করছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় লোকজন দাবি করেন, তিন সিএনজি চালককে আটক করলে মূল রহস্য বের হবে। তারা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অতিলোভে ৮টার আগে গাড়ী নিয়ে যাত্রী আসা নেয়া করে। সেদিন ৭টা ৩৫/৪০ মিনিটে গাড়ি না ছাড়লে হয়তো এত বড় একটি ঘটনার জন্ম নিতো না।

ঈদগড় একতা হিন্দু সমাজের সভাপতি অধির কান্তি দে বলেন, তারাও বিভিন্নজন থেকে এমন খবরটি পেয়েছেন। তবে ঘটনায় কারা জড়িত চিহ্নিত করতে পারেননি।

জনি দে রাজ খুনের ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক, সবাইকে আটক করে আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

খুনের শিকার কণ্ঠশিল্পী জনির বাবা তপন দে বলেন, আজকে ছেলের ৪ দিনের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান।

ব্যস্ততার কারণে তেমন একটা কথা বলতে না পারলেও তিনি ছেলে হত্যার বিচার চান সরকারের কাছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঈদগাঁও পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম আল মামুন জানান, ইতোপূর্বে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করা যাচ্ছে না।

তিনি আশা করছেন, খুব শ্রীঘ্রই জনি দে রাজের খুনের ঘটনায় জড়িতদের আটক করতে পারবেন।

উল্লেখ্য, গত ৮ অক্টোবর ভোরে পটিয়া উপজেলার হাসমত মঞ্জিল আমীর ভান্ডার দরবার শরীফ থেকে অনুষ্ঠান করে শ্যামলী পরিবহণের বাসে ঈদগাঁও বাসস্টেশনে নামেন পিতা-পুত্র। পরে স্টেশনের বার আউলিয়া হোটেল থেকে নাস্তা করে ছেলে আগে বাড়ির উদ্দেশ্যে সিএনজিতে রওনা দেন। পথিমধ্যে নৃশংস ভাবে খুনের শিকার হন আঞ্চলিক গানের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী জনি দে রাজ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: