মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০২:৫৭ পূর্বাহ্ন

মিয়ানমারের সমরসজ্জায় সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ছে

নয়াদিগন্ত:: / ৮৫ বার
আপডেট মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০২:৫৭ পূর্বাহ্ন
বিপি ৪৫ এ সালিডং বর্ডার ক্যাম্পের কাছাকাছি মিয়ানমারের সেনা ক্যাম্প

মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তে ব্যাপক সমরসজ্জার কারণে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাখাইন রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা দমনে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করা হলেও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশকে চাপে রাখাই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির কারণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুসারে, বাংলাদেশ সীমান্তের এক কিলোমিটারের মধ্যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সেনা ক্যাম্প স্থাপন করছে। এর মধ্যে দু’টি ফ্রিগেড, একটি কর্ভেড ও একটি সাবমেরিন রাখাইন পানিসীমায় নিয়ে আসার খবর পাওয়া গেছে। একই সাথে মাল্টিপল রকেট লাঞ্চার সিস্টেম ও এন্টি এয়ারক্রাফট সিস্টেম রাখাইনে নিয়ে আসা হয়েছে বলে জানা গেছে। একটি সূত্র উল্লেখ করেছে হেলিকপ্টারে করে মিয়ানমার বাহিনী অবৈধ ফসফরাস বোমা নিয়ে এসেছে রাখাইনে।

বিশেষজ্ঞরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বলছেন, কূটনৈতিক তৎপরতার সাথে সাথে বাংলাদেশের শক্তি প্রয়োগের অপশনটাও সামনে রাখা উচিত।

মিয়ানমারে সমরসজ্জার খবর এমন এক সময় পাওয়া যাচ্ছে যখন খোদ জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে রাখাইনে নতুন করে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। চলমান সেনা সমাবেশের সময়েই রাখাইনে গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার প্রধান বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুতে আবারো গণহত্যার মতো যুদ্ধাপরাধে জড়িয়ে পড়ছে মিয়ানমার। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, স্যাটেলাইট ইমেজ, ছবি এবং ভিডিও’র ওপর ভিত্তি করে জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে এই দাবি করা হয়েছে। তবে মিয়ানমার দাবি করছে এমন রিপোর্ট দেয়ার আগে জাতিসঙ্ঘের উচিত যাচাই করে নেয়া।
অবশ্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্যের সাথে সেখানকার অবস্থার মিল খুঁজে পাচ্ছেন না স্থানীয়রা। দি ইরাবতী পত্রিকায় ৪ সেপ্টেম্বর রাখাইনে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়ার একাধিক ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। বিবিসি এ ব্যাপারে ভিডিওর একটি ক্লিপ প্রচার করেছে।

এর আগে ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন, অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যার যে অভিযোগ ওঠে সে সময়ের সাথে এখনকার পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। ওই সময় মিয়ানমার থেকে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে বাংলাদেশে।
স্থানীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, রাখাইনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আরাকান আর্মির সাথে সৃষ্ট উত্তেজনার দোহাই দিয়ে মিয়ানমারের যে সামরিক প্রস্তুতি তা অনেকটাই কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবেলার মতো। রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশটি এখন আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সাথে ঢাকা যাতে একাত্ম না হয় তার জন্য বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য এ উদ্যোগ নেয়া হয়ে থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বিশেষত এখন বাংলাদেশ সীমান্তের ১ কিলোমিটারের মধ্যে সেনা ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করতে দেখা যাচ্ছে মিয়ানমারকে। এ ছাড়া রাখাইনে তিনটি সেনা ডিভিশনের বাইরে ওয়েস্টার্ন কমান্ডের অধীনে আরেকটি অনানুষ্ঠানিক ডিভিশন নিয়ে আসার খবর পাওয়া গেছে। এই কমান্ডের অধীনে ৫৪০, ৫৩৮, ৩১৭, ৫৩৮, ৩৬৬, ৫৪ ও ৫৫ ইনফেন্ট্রি ব্যাটালিয়ন রয়েছে। ১১ ও ৩৩ ডিভিশনের শক্তিও আরো বাড়ানো হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। বিশেষভাবে মংডু, বুচিডং, মংডু টাউনশিপ, ফকিরাবাজার, রাসিডং এলাকায় সেনাশক্তি বাড়ানো হয়েছে। এখানকার ইনফেন্ট্রি ও আর্টিলারি ব্যাটালিয়নের পাশাপাশি ৩৪ স্পেশাল ম্যাকানাইজড ইনফেন্ট্রি ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে এই সমরসজ্জায় সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে উত্তেজনা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষত সীমান্তের এপারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের যেসব স্বজন এখনো ওপারের বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয়শিবির ও বাড়িঘরে রয়েছে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিডিআরের (বর্তমান বিজিবি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) আ ল ম ফজলুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বাংকার করে নো ম্যানস ল্যান্ডের এক শ’ গজের কাছে অবস্থান করছে বলে এখন জানা যাচ্ছে। তবে এখনো তাদের কোনো এক্টিভিটিজ নেই। তারপরেও বলব, শত্রুকে দুর্বল ভাবার কোনো কারণ নেই। ওরা যেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে আছে তেমনি আমাদেরও প্রস্তুত থাকা উচিত। সে ক্ষেত্রে ওই এলাকায় একটি ব্রিগেড পাঠানো যেতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় ডিভিশনকে প্রস্তুত রাখা উচিত, যাতে কোনো অঘটন ঘটলে প্রতিহত করা যায়। একই সঙ্গে কেন তারা এই প্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান করছে সে বিষয়টি গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে সঠিকভাবে জানা উচিত।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ রুহুল আমীন মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি বাংলাদেশ যদি শুরু থেকে শক্তি প্রদর্শনের অপশনটাও সাথে রাখত তাহলে হয়তো এই পরিস্থিতি দেখতে হতো না।’

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ শুরু থেকে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ চেয়েছে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকটাই ছাড় দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর অনেক অত্যাচার হয়েছে। তারা যখন সাগরে ভাসছিল তখন বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করার জন্য বাংলাদেশকে বলেছে। বাংলাদেশও রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করেছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে। বাংলাদেশ কাউকে ক্ষেপাতে চায়নি। ভারত এবং চায়না দুটো রাষ্ট্রই মিয়ানমারের সাথে ঘনিষ্ঠ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করেছে। আন্তর্জাতিক ল-এর অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরেও বিশ্ব জেনেছে মিয়ানমার অপরাধ করেছে। এটাই বাংলাদেশে কূটনৈতিক বড় সফলতা।’

অধ্যাপক রুহুল আমীন উল্লেখ করেন, ‘সীমান্তে মিয়ানমার সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে মনে হয় বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। তারা মনে হয় বোঝাতে চাইছে বেশি বাড়াবাড়ি করলে তারা শক্তি প্রয়োগ করবে।’

তিনি বলেন, ‘যখন সমঝোতা চুক্তি হয়, তখন আমি বলেছিলাম চুক্তি অনুযায়ী যদি একজন রোহিঙ্গাও ফেরত যায় তবে আমি খুশি হব; কিন্তু যাবে না। এখন পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গা ফেরত যায়নি। সামনেও যাবে কি না সন্দেহ।’

অধ্যাপক রুহুল আমীন বলেন, ‘কূটনৈতিক তৎপরতার সাথে সাথে বাংলাদেশের শক্তি প্রয়োগের অপশনটাও রাখা উচিত।’

নয়াদিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: